বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করার জন্য কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ২০২৬ সালে এসে এই প্রক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক সহজ, ডিজিটাল এবং গুছানো হয়েছে। তবুও, নতুন উদ্যোক্তাদের অনেকেই বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্ত হন। তাই এই ব্লগে খুব সহজ বাংলায়, ধাপে ধাপে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আপনি যদি ২০২৬ সালে বাংলাদেশে একটি কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করতে চান, তাহলে এই গাইডটি আপনার জন্য সম্পূর্ণ সহায়ক হবে।
কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন কী ?
কোম্পানি নিবন্ধন হলো আপনার ব্যবসাকে সরকারিভাবে নিবন্ধন করা। বাংলাদেশে এই কাজটি করে থাকে RJSC (Registrar of Joint Stock Companies and Firms)। একবার রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলে, আপনার ব্যবসা একটি আইনি সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
ফলে আপনি সহজে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন, চুক্তি করতে পারেন এবং আইনগত নিরাপত্তার মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
২০২৬ সালে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন কেন জরুরি ?
২০২৬ সালে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সরকার এখন আইনগত নিয়ম-কানুনের উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই কারণে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করা খুবই জরুরি।
নিবন্ধিত কোম্পানি হলে—
- গ্রাহকের বিশ্বাস বাড়ে
- ব্যাংক লোন পাওয়া সহজ হয়
- বিদেশি বিনিয়োগ আনার সুযোগ তৈরি হয়
- সরকারি কাজ ও টেন্ডারে অংশ নেওয়া যায়
সুতরাং, একটি শক্ত ভিত্তির ব্যবসার জন্য রেজিস্ট্রেশন অপরিহার্য।
বাংলাদেশে কোম্পানি নিবন্ধের ধরন
রেজিস্ট্রেশনের আগে আপনাকে ঠিক করতে হবে, আপনি কোন ধরনের কোম্পানি খুলবেন।
১. প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কোম্পানি টাইপ এটি। এখানে কমপক্ষে ২ জন শেয়ারহোল্ডার ও ২ জন পরিচালক থাকতে হয়। তবে সর্বোচ্চ ৫০ জন শেয়ারহোল্ডার থাকতে পারেন।
ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য এটি সবচেয়ে ভালো।
২. পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি
এই ধরনের কোম্পানি শেয়ার বাজারে শেয়ার ছাড়তে পারে। তাই এখানে নিয়ম-কানুন একটু বেশি। সাধারণত বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই অপশন বেছে নেয়।
৩. ওয়ান পারসন কোম্পানি (OPC)
এটি একজন ব্যক্তির মালিকানাধীন কোম্পানি। তাই একক উদ্যোক্তার জন্য এটি খুবই সুবিধাজনক। ফ্রিল্যান্সার ও ছোট উদ্যোক্তারা এটি বেশি পছন্দ করেন।
৪. পার্টনারশিপ ফার্ম
এখানে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি অংশীদার হিসেবে ব্যবসা করেন। তবে এখানে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে হয়।
কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট দরকার হয়। যেমন—
- প্রস্তাবিত কোম্পানির নাম
- মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন (MOA)
- আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন (AOA)
- পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের জাতীয় পরিচয়পত্র / পাসপোর্ট
- অফিস ঠিকানা
- পরিচালক সম্মতিপত্র
ডকুমেন্ট সঠিক না হলে আবেদন বাতিল হতে পারে। তাই সতর্ক থাকা জরুরি।
নিবন্ধনের ধাপসমূহ
২০২৬ সালে বাংলাদেশে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়।
ধাপ ১: নাম ছাড়পত্র (Name Clearance)
প্রথমে RJSC ওয়েবসাইটে গিয়ে কোম্পানির নামের জন্য আবেদন করতে হয়। নামটি ইউনিক হতে হবে। অনুমোদন পেলে নামটি ৩০ দিনের জন্য সংরক্ষিত থাকে।
ধাপ ২: MOA ও AOA প্রস্তুত করা
এরপর MOA ও AOA তৈরি করতে হয়। এই ডকুমেন্টে কোম্পানির কাজ ও নিয়মাবলি লেখা থাকে। তাই এগুলো খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুত করতে হয়।
ধাপ ৩: ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা (বিদেশি শেয়ার থাকলে)
যদি বিদেশি বিনিয়োগকারী থাকে, তাহলে অস্থায়ী ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে মূলধন জমা দিতে হয়।
ধাপ ৪: অনলাইনে ডকুমেন্ট জমা
সব ডকুমেন্ট RJSC পোর্টালে অনলাইনে সাবমিট করতে হয়। এরপর সরকারি ফি পরিশোধ করতে হয়।
ধাপ ৫: সার্টিফিকেট অব ইনকরপোরেশন
সবকিছু ঠিক থাকলে RJSC থেকে Certificate of Incorporation দেওয়া হয়। তখনই আপনার কোম্পানি অফিসিয়ালি রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়।
কোম্পানি নিবন্ধনে কত সময় লাগে ?
২০২৬ সালে সাধারণত ৭ থেকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়। তবে ডকুমেন্ট ঠিক না থাকলে সময় বেশি লাগতে পারে।
কোম্পানি নিবন্ধনের খরচ
রেজিস্ট্রেশনের খরচ নির্ভর করে—
- অনুমোদিত মূলধন
- কোম্পানির ধরন
সরকারি ফি তুলনামূলকভাবে কম। তবে কনসালটেন্সি সার্ভিস নিলে অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনের পর যেসব কাজ করতে হবে
নিবন্ধনের পরও কিছু কাজ বাকি থাকে। যেমন—
- ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ
- টিআইএন সার্টিফিকেট
- ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন (প্রযোজ্য হলে)
- কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
এছাড়া, প্রতি বছর RJSC-তে বার্ষিক রিটার্ন জমা দিতে হয়।
বিদেশিরা কি বাংলাদেশে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করতে পারে ?
হ্যাঁ, ২০২৬ সালে বিদেশিরা বাংলাদেশে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন। সরকার বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহ দেয়। তবে কিছু অতিরিক্ত ডকুমেন্ট ও ব্যাংক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
উপসংহার
২০২৬ সালে বাংলাদেশে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। অনলাইন সিস্টেম উন্নত হওয়ায় এখন সময় ও ঝামেলা দুটোই কম।
আপনি যদি সঠিক পরিকল্পনা করেন এবং নিয়ম মেনে চলেন, তাহলে সহজেই কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন। একটি নিবন্ধিত কোম্পানি শুধু আইনগত নিরাপত্তাই দেয় না, বরং আপনার ব্যবসার ভবিষ্যৎকে আরও শক্ত করে।
আজই সঠিক সিদ্ধান্ত নিন, এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে আপনার ব্যবসা শুরু করুন।আরো জানতে ক্লিক করুন