ফায়ার লাইসেন্স নেওয়ার সম্পূর্ণ গাইড ২০২৬

ফায়ার লাইসেন্স কি ? 

২০২৬ সালে বাংলাদেশে যেকোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, কারখানা, অফিস কিংবা বহুতল ভবনের জন্য ফায়ার লাইসেন্স নেওয়া আইনত বাধ্যতামূলক। মূলত, Fire Service & Civil Defence (FSCD) এই লাইসেন্স প্রদান করে। অগ্নি প্রতিরোধ ও অগ্নি নির্বাপণ আইন, ২০০৩ এবং Bangladesh National Building Code (BNBC) অনুসারেই এটি ইস্যু হয়।

ফায়ার লাইসেন্স না থাকলে জরিমানা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে যায়। এমনকি আইনি জটিলতাও দেখা দিতে পারে। তাই আগেভাগেই লাইসেন্স নেওয়া নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

এই গাইডে আমরা ফায়ার লাইসেন্সের গুরুত্ব, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদন প্রক্রিয়া, ফি, নবায়ন ব্যবস্থা এবং ২০২৬ সালের আপডেটগুলো সহজভাবে তুলে ধরব। ফলে একজন ব্যবসায়ী নিজেই পুরো বিষয়টি বুঝতে পারবেন।

ফায়ার লাইসেন্স কেন প্রয়োজন ?

বাংলাদেশে প্রতি বছর অসংখ্য অগ্নিকাণ্ড ঘটে। বিশেষ করে শিল্প এলাকায় ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এই কারণেই সরকার ফায়ার লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করেছে।

ফায়ার লাইসেন্স নিশ্চিত করে যে আপনার প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন—ফায়ার এক্সটিংগুইশার, স্প্রিংকলার সিস্টেম, জরুরি বহির্গমন পথ এবং ইভ্যাকুয়েশন প্ল্যান।

এটি শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়। বরং কর্মী, গ্রাহক এবং সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম উপায়।

উদাহরণস্বরূপ, গার্মেন্টস কারখানা বা রেস্তোরাঁ ফায়ার লাইসেন্স ছাড়া চালালে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন হয় না। রাজউক বা সিটি কর্পোরেশন এমন আবেদন গ্রহণ করে না।

উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৫ সালে FSCD নতুন কিছু নিয়ম চালু করেছে। ২০২৬ সালে সেগুলো আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে। এর মধ্যে ডিজিটাল আবেদন এবং স্মার্ট ইন্সপেকশন অন্যতম।

ফায়ার লাইসেন্স থাকলে আপনার ব্যবসা পায়—

  • আইনি সুরক্ষা ও বিমা সুবিধা

  • কর্মীদের আস্থা

  • রপ্তানিমুখী ব্যবসায় ক্রেতার বিশ্বাস

কারা ফায়ার লাইসেন্স নিতে বাধ্য?

যেসব প্রতিষ্ঠানে অগ্নির ঝুঁকি রয়েছে, তাদের জন্য ফায়ার লাইসেন্স প্রযোজ্য। যেমন—

  • কারখানা, গুদাম ও ওয়ার্কশেড

  • ৬ তলার বেশি বাণিজ্যিক ভবন

  • ১০ তলার বেশি আবাসিক ভবন

  • হাসপাতাল, শপিং মল, রেস্তোরাঁ ও সিনেমা হল

তবে অনেক ক্ষেত্রে ছোট দোকানের জন্যও লাইসেন্স লাগতে পারে। এটি স্থানীয় FSCD অফিস নির্ধারণ করে। ভালো খবর হলো, ২০২৬ সালে অনলাইন পোর্টাল থেকে বিষয়টি সহজেই যাচাই করা যায়।

প্রয়োজনীয় নথিপত্র

আবেদন করার আগে নিচের কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা জরুরি। সব নথি PDF ফরম্যাটে স্ক্যান করতে হবে।

  • বৈধ ট্রেড লাইসেন্সের কপি

  • আবেদনকারী ও মালিকের NID

  • ভাড়া চুক্তি বা জমির দলিল

  • RAJUK/পৌরসভা অনুমোদিত লেআউট প্ল্যান

  • সিটি কর্পোরেশনের বার্ষিক মূল্যায়ন সনদ

  • MOA (লিমিটেড কোম্পানির জন্য)

  • নোটারি করা “মামলা নেই” অ্যাফিডেভিট

  • স্থানীয় NOC (প্রয়োজন অনুযায়ী)

  • পাসপোর্ট সাইজ ছবি (২ কপি)

👉 গার্মেন্টস কারখানার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফায়ার সেফটি প্ল্যান দিতে হয়।

অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া (২০২৬)

২০২৬ সালে ফায়ার লাইসেন্সের আবেদন প্রক্রিয়া প্রায় সম্পূর্ণ ডিজিটাল। মূল পোর্টাল হলো elicense.fireservice.gov.bd

প্রথমে, ওয়েবসাইটে গিয়ে “Apply for New License” অপশন নির্বাচন করুন। এরপর মোবাইল নম্বর ও ইমেইল দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলুন।

এরপর প্রতিষ্ঠানের তথ্য পূরণ করুন। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করুন।

ফর্ম সাবমিট করার পর আবেদনপত্রের দুই কপি প্রিন্ট নিন। পরে নিকটস্থ OSSC বা FSCD জেলা অফিসে জমা দিন।

এরপর ইন্সপেক্টর সাইট ভিজিট করেন। তিনি ফায়ার এক্সটিংগুইশার, সাইনেজ ও সেফটি ব্যবস্থা পরীক্ষা করেন।

সব ঠিক থাকলে ডিমান্ড নোট ইস্যু হয়। তখন নির্দিষ্ট ট্রেজারি কোডে ফি জমা দিতে হয়। পুনরায় ইন্সপেকশন শেষে লাইসেন্স ইস্যু করা হয়।

সাধারণত পুরো প্রক্রিয়ায় ৩০–৯০ কার্যদিবস সময় লাগে। আবেদন ID দিয়ে অনলাইনে স্ট্যাটাস ট্র্যাক করা যায়।

 

নবায়ন প্রক্রিয়া

লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৩০ দিন আগে নবায়নের আবেদন করা উচিত।

পুরনো লাইসেন্স ও চালান কপি নিয়ে অনলাইনে আবেদন করুন। প্রয়োজনে ইন্সপেকশন হয়। এরপর ফি জমা দিলে নতুন লাইসেন্স ইস্যু হয়।

দেরিতে নবায়ন করলে ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

BNBC অনুযায়ী ফায়ার সেফটি মানদণ্ড

লাইসেন্স পেতে কিছু নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হবে—

  • প্রতি ৭৫ বর্গমিটারে ১টি ABC এক্সটিংগুইশার

  • বড় ভবনে অটোমেটিক স্প্রিংকলার

  • কমপক্ষে দুটি জরুরি বহির্গমন পথ

  • স্মোক ডিটেক্টর ও অ্যালার্ম সিস্টেম

  • সঠিক ইলেকট্রিক্যাল ব্রেকার

FSCD নির্দেশনা মেনে চললে অনুমোদন সহজ হয়।

২০২৬ সালের নতুন আপডেট

  • সম্পূর্ণ অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা

  • AI-ভিত্তিক স্মার্ট ইন্সপেকশন

  • ফি ১০–২০% পর্যন্ত বৃদ্ধি

  • ই-লাইসেন্স ডাউনলোড সুবিধা

  • কিছু ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল ইন্সপেকশন

এছাড়া ঢাকায় নতুন OSSC চালু হওয়ায় প্রক্রিয়া দ্রুত হয়েছে।

সাধারণ সমস্যা ও সমাধান

ডিমান্ড নোট পেতে দেরি হলে নথি আবার যাচাই করুন।
ইন্সপেকশন ফেল করলে প্রয়োজনীয় ফায়ার ইকুইপমেন্ট বসান।
ফি বেশি মনে হলে DED অফিসে আপিল করা যায়।

 

উপসংহার

ফায়ার লাইসেন্স শুধু একটি কাগজ নয়। এটি জীবন ও সম্পদ রক্ষার অন্যতম প্রধান উপায়। ২০২৬ সালে অনলাইন সিস্টেম ব্যবহার করলে পুরো প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়। চাইলে অভিজ্ঞ কনসালটেন্টের সহায়তাও নিতে পারেন। নিরাপদ ব্যবসাই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের চাবিকাঠি। আরো জানতে