বাংলাদেশে ই-জিপি (E-GP) রেজিস্ট্রেশন: সরকারি টেন্ডারে অংশগ্রহণের পূর্ণাঙ্গ, আপডেটেড গাইড

বর্তমান বাংলাদেশে সরকারি টেন্ডার মানেই আর ফাইল-ফোল্ডার হাতে দৌড়াদৌড়ি নয়। ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তব রূপ এখন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় ই-জিপি (E-GP – Electronic Government Procurement) সিস্টেমে। আপনি যদি ঠিকাদার, সাপ্লায়ার, কনসালটেন্ট কিংবা নতুন উদ্যোক্তা হন—সরকারি কাজ পেতে চাইলে ই-জিপি রেজিস্ট্রেশন আজ বাধ্যতামূলক।

ই-জিপি চালুর আগে সরকারি দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, সময় এবং খরচ—সবকিছুতেই নানা জটিলতা ছিল। কিন্তু এখন? কয়েক ক্লিকেই টেন্ডার দেখা, ডাউনলোড করা, বিড সাবমিট করা—সবই অনলাইনে। ফলে ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় ঠিকাদার—সবার জন্যই সুযোগ সমান।

অনেকে মনে করেন, “ই-জিপি নিবন্ধন খুব জটিল”, “অনেক কাগজ লাগে”, “নতুন হলে সম্ভব না”—এই ধারণাগুলো পুরোপুরি ভুল। সঠিক গাইডলাইন জানলে বাংলাদেশে ই-জিপি নিবন্ধন আসলে বেশ সহজ, সময়সাশ্রয়ী এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসার জন্য দারুণ লাভজনক।

এই আর্টিকেলে আপনি জানবেন—

  • ই-জিপি কী এবং কেন দরকার
  • কারা রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন
  • ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া
  • খরচ, সময়, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট
  • নতুন ব্যবসায়ীদের জন্য বাস্তব টিপস
  • সাধারণ ভুল ও সেগুলো এড়ানোর উপায়

সবকিছু এক জায়গায়, আপডেটেড তথ্যসহ, সহজ ভাষায়। চলুন, শুরু করা যাক।

ই-জিপি (E-GP) কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

ই-জিপি বা Electronic Government Procurement হলো বাংলাদেশ সরকারের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সব সরকারি টেন্ডার ডিজিটালি প্রকাশ ও পরিচালনা করা হয়। এই সিস্টেমের মাধ্যমে দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়, দুর্নীতি কমে এবং সময় বাঁচে।

আগে যেখানে টেন্ডার কিনতে লাইনে দাঁড়াতে হতো, এখন সেখানে ২৪/৭ অনলাইনে টেন্ডার দেখা যায়। ব্যবসায়ীদের জন্য এটি শুধু একটি প্ল্যাটফর্ম নয়—এটি সরকারি কাজ পাওয়ার মূল চাবিকাঠি।

বাংলাদেশে ই-জিপি সিস্টেম পরিচালনা করে কারা

বাংলাদেশে ই-জিপি সিস্টেম পরিচালনা করে CPTU (Central Procurement Technical Unit), যা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। CPTU নিশ্চিত করে যেন সব সরকারি সংস্থা একই নিয়মে, একই প্ল্যাটফর্মে টেন্ডার প্রকাশ করে।

ই-জিপি নিবন্ধন কারা করতে পারবেন 

  • ব্যক্তিগত ঠিকাদার
  • প্রোপ্রাইটরশিপ ব্যবসা
  • পার্টনারশিপ ফার্ম
  • প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি
  • সাপ্লায়ার ও কনসালটেন্ট

শর্ত একটাই—আপনার বৈধ ব্যবসায়িক কাগজপত্র থাকতে হবে।

নতুন ব্যবসায়ীদের জন্য ই-জিপি রেজিস্ট্রেশন সুবিধা

অনেকেই ভাবেন নতুন ব্যবসা হলে ই-জিপিতে সুযোগ নেই। আসলে বাস্তবতা উল্টো। অনেক সরকারি কাজ ছোট বাজেটের হয়, যেখানে নতুন ব্যবসায়ীরাই বেশি সুযোগ পান। সঠিক ক্যাটাগরি বেছে নিলে নতুন উদ্যোক্তারাও নিয়মিত কাজ পেতে পারেন।

ই-জিপি নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট

  • ট্রেড লাইসেন্স
  • TIN সার্টিফিকেট
  • জাতীয় পরিচয়পত্র
  • ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট
  • ব্যাংক একাউন্ট তথ্য
  • ই-মেইল ও মোবাইল নম্বর

সব ডকুমেন্ট স্ক্যান করে প্রস্তুত রাখলে প্রক্রিয়া দ্রুত হয়।

ধাপে ধাপে E-GP রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া

. ইউজার একাউন্ট তৈরি

প্রথমে CPTU-এর অফিসিয়াল ই-জিপি পোর্টালে গিয়ে ইউজার একাউন্ট খুলতে হয়। এখানে ব্যবসার তথ্য, মালিকের তথ্য দিতে হয়।

. ব্যাংক একাউন্ট লিংক করা

নির্ধারিত ব্যাংকের মাধ্যমে আপনার একাউন্ট ই-জিপির সাথে লিংক করতে হয়। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

. ফি পরিশোধ

নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফি অনলাইনে বা ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।

ই-জিপি নিবন্ধের খরচ কত

সাধারণত ৫,০০০ টাকা থেকে ১০,০০০ টাকার মধ্যে নিবন্ধন ফি হতে পারে, যা ক্যাটাগরি অনুযায়ী ভিন্ন হয়।

ই-জিপি রেজিস্ট্রেশন করতে কত সময় লাগে

সব কাগজ ঠিক থাকলে সাধারণত ৭–১০ কর্মদিবসের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়।

একাধিক ক্যাটাগরি সাব-ক্যাটাগরি নির্বাচন

আপনি চাইলে একাধিক কাজের ক্যাটাগরি নির্বাচন করতে পারেন। এতে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

টেন্ডার খোঁজা বিড সাবমিট করার নিয়ম

নিবন্ধন সম্পন্ন হলে ড্যাশবোর্ড থেকে টেন্ডার দেখা, ডকুমেন্ট ডাউনলোড এবং অনলাইনে বিড সাবমিট করা যায়।

সাধারণ সমস্যা সমাধান

  • ভুল ডকুমেন্ট আপলোড → আগেই চেক করুন
  • ব্যাংক লিংক সমস্যা → নির্ধারিত ব্যাংকে যোগাযোগ করুন
  • পাসওয়ার্ড সমস্যা → রিসেট অপশন ব্যবহার করুন

ই-জিপি রেজিস্ট্রেশনের সুবিধা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ই-জিপি শুধু আজকের জন্য নয়—এটি ভবিষ্যতের ব্যবসার নিরাপদ ভিত্তি। নিয়মিত সরকারি কাজ মানেই স্থায়ী আয়, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বড় প্রজেক্টের সুযোগ।

FAQs: বাংলাদেশে ই-জিপি (E-GP) রেজিস্ট্রেশন 

জিপি রেজিস্ট্রেশন কেন প্রয়োজন?

সরকারি টেন্ডারে অংশ নিতে ই-জিপি রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। এটি ছাড়া কোনো অনলাইন দরপত্রে বিড করা যায় না।

নতুন ব্যবসায়ী কি জিপিতে আবেদন করতে পারে?

হ্যাঁ, নতুন ব্যবসায়ীরাও ই-জিপি রেজিস্ট্রেশন করে সরকারি কাজ পেতে পারেন।

ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া কি জিপি রেজিস্ট্রেশন সম্ভব?

না, বৈধ ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ই-জিপি রেজিস্ট্রেশন করা যায় না।

জিপি রেজিস্ট্রেশন ফি কি একবারই দিতে হয়?

হ্যাঁ, নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য একবার ফি দিতে হয়। পরে নবায়ন প্রয়োজন হতে পারে।

জিপি রেজিস্ট্রেশন বাতিল হতে পারে কি?

ভুল তথ্য বা নিয়ম ভঙ্গ করলে রেজিস্ট্রেশন স্থগিত বা বাতিল হতে পারে।

উপসংহার 

বাংলাদেশে ই-জিপি (E-GP) রেজিস্ট্রেশন এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি ব্যবসার জন্য একেবারে অপরিহার্য। আপনি যদি সরকারি কাজ করতে চান, নিজের ব্যবসাকে স্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য করতে চান, তাহলে আজই ই-জিপি রেজিস্ট্রেশন শুরু করা উচিত।

সঠিক তথ্য, সঠিক প্রস্তুতি আর একটু ধৈর্য—এই তিনটি থাকলেই ই-জিপি আপনার ব্যবসার জন্য খুলে দেবে নতুন দরজা। আজই সিদ্ধান্ত নিন, ডিজিটাল বাংলাদেশে আপনার ব্যবসার অবস্থান শক্ত করুন।আরো জানতে