বিদেশ থেকে পণ্য এনে বিক্রি করা, কিংবা দেশের পণ্য বিদেশে পাঠানো, অনেকের কাছেই লাভজনক ব্যবসার স্বপ্ন। কিন্তু শুরুর আগেই একটা প্রশ্ন মাথায় ঘোরে: import export license বলতে আসলে কী কী লাগে? Trade license, TIN,আর ব্যাংক সনদ লাগবে। এরপর CCI&E থেকে আইআরসি বা ইআরসি নিতে হবে। এই লেখায় ধাপে ধাপে সবটা বুঝিয়ে বলছি। ফলে অযথা দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না।
Import export license আসলে কী?
প্রথমেই একটা ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। import export license নামে একটাই আলাদা কাগজ নেই। এটা কয়েকটা নিবন্ধন আর সনদের সমষ্টি। সবগুলো একসঙ্গে থাকলে আপনি বৈধভাবে আমদানি-রপ্তানি করতে পারবেন।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সনদ হলো:
- IRC (Import Registration Certificate): পণ্য আমদানি করতে লাগে।
- ERC (Export Registration Certificate): পণ্য রপ্তানি করতে লাগে।
দুটোই দেয় প্রধান আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, যাকে সংক্ষেপে CCI&E বলা হয়। এটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। আপনি যদি শুধু আমদানি করেন, তাহলে আইআরসি যথেষ্ট। শুধু রপ্তানি করলে ইআরসি লাগবে। দুটো কাজই করলে দুটো সনদই নিতে হবে।
শুরুর আগে ব্যবসার ধরন ঠিক করুন
লাইসেন্সের কাগজ জোগাড়ের আগে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনি কোন কাঠামোতে ব্যবসা করবেন? সাধারণত তিনটি পথ আছে।
১. একক মালিকানা (প্রোপ্রাইটরশিপ): এটা সবচেয়ে সহজ। খরচ কম, কাগজপত্রও কম। ছোট আকারে শুরু করলে এটাই ভালো।
২. অংশীদারি ব্যবসা: একাধিক মানুষ মিলে করলে এটা বেছে নিতে পারেন। এতে অংশীদারি চুক্তির দলিল লাগে।
৩. প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি: বড় পরিসরে কাজ করতে চাইলে এটা ভালো। তবে এর জন্য আরজেএসসিতে নিবন্ধন করতে হয়। এতে মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন লাগে। কোম্পানি করার বিস্তারিত নিয়ম জানতে দেখুন আমাদের কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন গাইড।
ধরুন, রাহিম ঢাকায় চীন থেকে মোবাইল অ্যাক্সেসরিজ আনতে চান। তিনি একা শুরু করবেন। তাই তাঁর জন্য প্রোপ্রাইটরশিপই সহজ। আবার আরেকজন ব্যবসায়ী পাটজাত পণ্য রপ্তানি করবেন, আর তাঁর সঙ্গে দুজন বিনিয়োগকারী আছেন। তাঁর জন্য কোম্পানি করাই বেশি নিরাপদ।
Import export license পেতে যে নথিগুলো লাগে
এবার আসল অংশে আসি। আবেদনের আগে নিচের কাগজগুলো গুছিয়ে রাখুন। প্রায় সব আবেদনেই এগুলো চাওয়া হয়।
১. ট্রেড লাইসেন্স
এটা ব্যবসার প্রথম বৈধ পরিচয়। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এটা নিতে হয়। আপনার ব্যবসার ঠিকানা যেখানে, সেখানকার কর্তৃপক্ষই লাইসেন্স দেবে। ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসার ধরন হিসেবে আমদানি বা রপ্তানি লেখা থাকলে ভালো। কারণ পরে ব্যাংক ও CCI&E এই বিষয়টা খুঁটিয়ে দেখে। বিস্তারিত পেতে পড়ুন ট্রেড লাইসেন্স করার নিয়ম।
২. ই-টিআইএন সনদ
টিআইএন মানে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর। এটা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওয়েবসাইট থেকে অনলাইনে করা যায়। ব্যক্তির নামে একটি টিআইএন থাকে। কোম্পানি হলে কোম্পানির নামেও আলাদা টিআইএন লাগে।
৩. বিআইএন (ভ্যাট নিবন্ধন)
আমদানি-রপ্তানির কাজে সাধারণত বিআইএন লাগে। এটা মূলত ভ্যাট নিবন্ধনের নম্বর। এনবিআরের অনলাইন পোর্টালেই এই নিবন্ধন করা যায়। বিআইএন না থাকলে কাস্টমসে পণ্য ছাড়াতে সমস্যা হতে পারে।
৪. ব্যাংক হিসাব ও ব্যাংক সনদ
ব্যবসার নামে একটি চলতি হিসাব খুলুন। এরপর সেই ব্যাংক থেকে সচ্ছলতার সনদ (solvency certificate) নিন। এই সনদ দেখায় যে আপনার আর্থিক সামর্থ্য আছে। আইআরসি ও ইআরসি দুটোতেই এটা লাগে। আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খুলতেও এই ব্যাংকই ভরসা। এলসি সংক্রান্ত নিয়ম ঠিক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাদের ওয়েবসাইটে সর্বশেষ সার্কুলার পাবেন।
৫. চেম্বার বা ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ
স্বীকৃত কোনো বণিক সমিতির সদস্য হতে হয়। ঢাকা চেম্বার (DCCI), মেট্রোপলিটন চেম্বার (MCCI) বা আপনার জেলার চেম্বার হতে পারে। তারা সদস্যপদের সনদ দেবে। অনেকেই এই ধাপটা ভুলে যান। অথচ এটা ছাড়া আবেদন আটকে যায়।
৬. কোম্পানির দলিলপত্র (কোম্পানি হলে)
লিমিটেড কোম্পানি হলে ইনকর্পোরেশন সনদ লাগবে। সঙ্গে দিতে হবে মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেলস। অংশীদারি হলে অংশীদারি চুক্তির দলিল লাগে। আরজেএসসির অফিসিয়াল তথ্য পাবেন রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ।
৭. ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র ও ছবি
আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট সাইজ ছবি আর ঠিকানার প্রমাণ লাগবে। নমিনির তথ্যও কখনো চাওয়া হয়। তাই সব কাগজের স্ক্যান কপি আগেই তৈরি রাখুন।
IRC কী এবং কীভাবে পাবেন?
আইআরসি হলো আমদানির অনুমতিপত্র। এটা ছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পণ্য আনা যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলতে গেলেও ব্যাংক প্রথমে আপনার আইআরসি দেখতে চাইবে।
আইআরসি সাধারণত দুই ধরনের হয়:
- বাণিজ্যিক (Commercial): যারা পণ্য এনে বিক্রি করেন, তাঁদের জন্য।
- শিল্প (Industrial): যারা কারখানার কাঁচামাল বা যন্ত্রপাতি আনেন, তাঁদের জন্য।
আরেকটা বিষয় জানা দরকার। আমদানিকারকদের বার্ষিক আমদানির সীমা অনুযায়ী কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। শ্রেণি অনুযায়ী নিবন্ধন ফি আর নবায়ন ফি আলাদা হয়। তাই আপনার ব্যবসার আকার আন্দাজ করে সঠিক শ্রেণি বেছে নিন। ফির সর্বশেষ তালিকা সিসিআইঅ্যান্ডই-এর ওয়েবসাইটে দেখে নেবেন। কারণ সরকার সময়ে সময়ে ফি বদলাতে পারে।
ERC কী এবং কীভাবে পাবেন?
ইআরসি হলো রপ্তানির অনুমতিপত্র। এটা থাকলে আপনি নিষিদ্ধ বা সীমিত তালিকার বাইরের যেকোনো পণ্য রপ্তানি করতে পারবেন। এতে পরিমাণ বা মূল্যের বাড়তি বাধা থাকে না।
ইআরসির নথি অনেকটা আইআরসির মতোই। ট্রেড লাইসেন্স, ই-টিআইএন, ব্যাংক সনদ আর চেম্বারের সনদ লাগে। রপ্তানির সময় আপনাকে ব্যাংকের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন দেখাতে হয়। তাই একটি ভালো ব্যাংকের সঙ্গে শুরু থেকেই সম্পর্ক রাখা জরুরি। ইআরসিও প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়।
Import export license-এর আবেদন করবেন কীভাবে?
আগে এই কাজ কাগজে হতো। এখন পুরো প্রক্রিয়া CCI&E- এর অনলাইন লাইসেন্সিং মডিউলে (OLM) হয়। তাই ঘরে বসেই আবেদন করা যায়।
ধাপগুলো এরকম:
- অ্যাকাউন্ট খুলুন। প্রথমে সিসিআইঅ্যান্ডই-এর অনলাইন পোর্টালে নিবন্ধন করুন।
- তথ্য দিন। এরপর ব্যবসার নাম, ঠিকানা আর মালিকের তথ্য পূরণ করুন।
- নথি আপলোড করুন। ওপরের সাতটি নথির স্ক্যান কপি জমা দিন।
- ফি জমা দিন। সবশেষে অনলাইনে সরকারি ফি পরিশোধ করুন।
- যাচাইয়ের অপেক্ষা করুন। কর্তৃপক্ষ নথি দেখে ঠিক থাকলে সনদ ইস্যু করবে।
একটা ছোট পরামর্শ দিই। আবেদনের আগে সব নথির নাম ও ঠিকানা মিলিয়ে দেখুন। ট্রেড লাইসেন্সে এক বানান, টিআইএনে আরেক বানান থাকলে আবেদন আটকে যেতে পারে। এই ভুলটা নতুনদের মধ্যে খুব বেশি দেখা যায়।
আবেদনের প্রক্রিয়া বা পোর্টালের ধাপ সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। তাই আবেদনের আগে সিসিআইঅ্যান্ডই-এর সর্বশেষ নির্দেশনা একবার দেখে নিন।
পণ্যভেদে বাড়তি অনুমতি লাগতে পারে
আইআরসি বা ইআরসি থাকলেই সব পণ্যের ছাড়পত্র মিলে যায় না। কিছু পণ্যের জন্য আলাদা অনুমতি লাগে। যেমন:
- খাদ্যদ্রব্য ও ভোগ্যপণ্যে BSTI-এর মান সনদ দরকার হতে পারে।
- ওষুধ বা প্রসাধনীতে ঔষধ প্রশাসনের অনুমতি লাগে।
- উদ্ভিদ বা কৃষিপণ্যে কোয়ারেন্টাইন সনদ লাগে।
- কিছু পণ্য আমদানি নীতিতে নিষিদ্ধ বা শর্তসাপেক্ষ।
তাই পণ্য বেছে নেওয়ার সময়ই আমদানি নীতি আদেশ দেখে নিন। কোন পণ্য আনা যাবে আর কোনটা যাবে না, সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে। এতে পরে বড় লোকসান এড়ানো যায়।
Import export license নবায়ন ও সাধারণ ভুল
আইআরসি ও ইআরসি দুটোই প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়। নবায়ন না করলে সনদ অচল হয়ে যায়। তখন নতুন চালান আনা বা পাঠানো আটকে যেতে পারে। তাই ক্যালেন্ডারে একটা রিমাইন্ডার রাখুন।
নতুন ব্যবসায়ীরা যেসব ভুল বেশি করেন, সেগুলো হলো:
- মেয়াদোত্তীর্ণ ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে আবেদন করা। ফলে আবেদন বাতিল হয়।
- ভুল শ্রেণি বেছে নেওয়া। পরে আমদানির সীমা বাড়াতে ঝামেলা হয়।
- বিআইএন ছাড়া পণ্য আনার চেষ্টা। এতে কাস্টমসে আটকে যায়।
- এজেন্টের ওপর পুরো ভরসা করা। তাঁকে অবশ্যই ফি ও নথির রসিদ চেয়ে নিন।
আরেকটা কথা। নভেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের কথা আছে। এর পর বাণিজ্য নীতি ও শুল্ক-সুবিধায় কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তাই নিয়মিত সরকারি ঘোষণার দিকে নজর রাখুন।
Segunbagicha Consultancy কেন বেছে নেবেন
Import export license-এর কাগজপত্র গোছানো, ফরম পূরণ আর ফি জমা দেওয়ার কাজটা অনেকের কাছেই ঝামেলার মনে হয়। একটা নথিতে ভুল থাকলে পুরো আবেদন আটকে যেতে পারে। Segunbagicha Consultancy এই কাজগুলো আপনার হয়ে সম্পন্ন করে দেয়। নথি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে আইআরসি বা ইআরসির আবেদন জমা দেওয়া পর্যন্ত আমরা পাশে থাকি। ফলে প্রতিটি ধাপ আলাদা করে বুঝতে গিয়ে আপনার সময় নষ্ট হয় না।
আপনার এখনও ট্রেড লাইসেন্স বা BIN সার্টিফিকেট না থাকলে সেগুলোও আমরা তৈরি করে দিই। এতে সব কাগজ একসঙ্গে গুছিয়ে পাওয়া যায়। নবায়নের তারিখ কাছে এলে আমরা মনে করিয়ে দিই, তাই আপনার সনদ কখনো মেয়াদোত্তীর্ণ হয় না। ব্যবসার জন্য আরও যেসব সেবা লাগতে পারে, তা দেখে নিন আমাদের সার্ভিস তালিকা পাতায়।
আজই পরামর্শ নিন
আমদানি বা রপ্তানির ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করছেন, কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না? তাহলে আজই যোগাযোগ করুন। আপনার ব্যবসার ধরন শুনে আমরা বলে দেব কোন কোন নথি লাগবে আর কীভাবে এগোতে হবে।
ঠিকানা: ৩৬ তোপখানা রোড, ফারইস্ট টাওয়ার–২ (৩য় তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা
কল করুন: +৮৮ ০১৯৩৩–৩৫৩৫১৫
WhatsApp: +৮৮ ০১৯৩৩–৩৫৩৫০৬
Segunbagicha Consultancy — আপনার ব্যবসার রেজিস্ট্রেশন ও কমপ্লায়েন্সের নির্ভরযোগ্য সহযোগী।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: আইআরসি আর ইআরসি কি একই জিনিস?
না। IRC আমদানির জন্য, আর ERC রপ্তানির জন্য। দুটোই সিসিআইঅ্যান্ডই দেয়।
প্রশ্ন ২: একটা কোম্পানি কি একসঙ্গে আইআরসি ও ইআরসি রাখতে পারে?
পারে। আমদানি ও রপ্তানি দুটো করলে দুটো সনদই রাখা ভালো।
প্রশ্ন ৩: একক মালিকানার ব্যবসাতেও কি লাইসেন্স মিলবে?
হ্যাঁ। ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় নথি থাকলে প্রোপ্রাইটরশিপেও আবেদন করা যায়।
প্রশ্ন ৪: সনদ নবায়ন কি বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ। প্রতি বছর নবায়ন না করলে সনদ কার্যকর থাকে না।

